Live Love Laugh...
12 Dec 2018

ভারতে আত্মহত্যার প্রবণতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সমগ্র বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহননের পথ বেছে নেন(সূত্র)|

আত্মহত্যার পিছনে এমনিতে বিভিন্ন কারণ থাকলেও, অবসাদ, দুশ্চিন্তা, স্কিৎজোফ্রেনিয়া, মানসিক চাপ ইত্যাদি, এর সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ভারতে ৩.৩% ব্যক্তি, আর্থিক অনটন, ঋণ পরিশোধ করতে না পারা এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন(সূত্র)|

একটি জনস্বাস্থ্য সংকট

ল্যান্সেট পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণাতে জানানো হয়েছে যে ভারতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার স্থান নবম। কেবল ২০১৬ সালেই, ভারতে ২,৩০,৩১৪টি (সূত্র)আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। যেহেতু, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ঐতিহাসিক আইনটি আসার আগে পর্যন্ত আত্মহত্যা একটি আইনত দন্ডনীয় অপরাধ ছিল, সম্ভবত তাই আত্মহত্যার অনেক ঘটনাই নথিভুক্ত হয়নি।

১৯৯০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে, আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনক ভাবে ৪০.১% বেড়ে গিয়েছে। অর্থাৎ ১৯৯০ সালে যা ১.৬৪ লাখ ছিল, তা ২০১৬ সালে এসে ২.৩০ লাখে দাঁড়িয়েছে।

স্বাভাবিক ভাবেই বহু গবেষকেরাই দাবি করেছেন যে ভারতে আত্মহত্যা “একটি জনস্বাস্থ্য সংকট” এবং অবিলম্বে এই দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

এক জনের আত্মহত্যার় ফলে তাঁর পরিবারে কমপক্ষে ছ’জন মানসিক ভাবে বিদ্ধস্ত হয়ে পড়েন (সূত্র). এই ব্যক্তিদের মধ্যে অবসাদের লক্ষণ দেখা যায় এবং পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করার সময় আত্মহত্যা করার কথা ভাবেন।

মহিলা

মহিলাদের মধ্যে সাধারণত বিভিন্ন মানসিক সমস্যা যেমন অবসাদ, দুশ্চিন্তা, দৈহিক (বা বিশিষ্ট ভাবে শারীরিক) সমস্যা ইত্যাদির প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায় (সূত্র)। ল্যান্সেট পত্রিকার যে গবেষণার কথা আগে বলা হয়েছে তাতে দেখা গিয়েছে যে আত্মহত্যাকারী প্রতি ৫ জন মহিলার মধ্যে প্রায় ২ জন মহিলাই ভারতীয়।

মহিলাদের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার প্রধান কারণগুলি হল:

  • বড় পরিবার
  • অল্প বয়সে বিয়ে
  • অবাঞ্ছিত / অপ্রত্যাশিত মাতৃত্ব
  • বেকারত্ব
  • অবাস্তব সামাজিক চাহিদা
Suicidal thoughts

উপরোক্ত কারণগুলির সাথে যোগ হয় মানসিক চিকিৎসার সুযোগের অভাব, যার ফলে মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই সবের ফলে তাঁরা অবসাদ ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজর্ডারের (পি.টি.এস.ডি.) মতন অসুখের শিকার হন, যা তাদেরকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

২০১৬ সালে গোটা বিশ্বে মোট ২,৫৭,৬২৪ জন মহিলা আত্মহত্যা করেন, যাদের মধ্যে ৩৭% অর্থাৎ ৯৪,৩৮০ জন মহিলা ভারতীয়। ল্যান্সেট পত্রিকার একটি প্রতিবেদন বলছে, “১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী এবং ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী মহিলাদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হল আত্মহত্যা”। এঁদের মধ্যে বিবাহিত মহিলাদের সংখ্যাই বেশি বলে সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, “অল্প বয়সে সম্বন্ধ দেখে বিয়ে, কম বয়সে বাচ্চা হয়ে যাওয়া, পারিবারিক হিংসা, এবং সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক স্বনির্ভরতার অভাবের কারণে আত্মহত্যা, আর যাই হোক বিয়ে দিয়ে ঠেকানো সম্ভব নয় বললেই চলে।”

মহিলাদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

যুবসমাজ

ভারতের ৫০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যার বয়স ২৫ বছরের নিচে (সূত্র)। কিন্তু ল্যান্সেট পত্রিকার ওই গবেষণা বলছে যে, ভারতের মতন একটি দেশে যুবসমাজ আশঙ্কাজনক হারে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে।

ল্যান্সেট পত্রিকার মতে, “১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী এবং ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ভারতীয়দের মধ্যে মৃত্যুর প্রধান কারণই হল আত্মহত্যা। অন্যান্য দেশে এই দুই বয়সীদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা যথাক্রমে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে।” এছাড়া এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, ২০১৬ সালে মোট ১,৪৫,৫৬৭টি তরতাজা প্রাণ আত্মহত্যার কবলে হারিয়েছে, যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। সুবিশাল এই সংখ্যাটা সেই বছরে হওয়া মোট আত্মহত্যার ৬৩%। এঁদের সকলের এই রাস্তা বেছে নেওয়ার পিছনে যে কারণগুলি কাজ করেছে, তা হল:

  • পারিবারিক অশান্তি
  • পরীক্ষার ফলাফল
  • প্রেমঘটিত সমস্যা
  • স্কুলে, কলেজে বা কর্মক্ষেত্রে সমস্যা
  • ভুল কেরিয়ার নির্বাচন
  • ব্যক্তিগত সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি
  • মাদকাসক্তি
Suicidal thoughts

আমাদের সমাজে সবাই একে অপরের থেকে আরও দূরে সরে যাওয়ার কারণে, ছাত্র-ছাত্রীরা মানসিক চাপের সময় কাউকে পাশে পায় না। বিশেষ করে যখন তাদেরকে চারপাশ থেকে অবাস্তব চাহিদা এবং জীবনে হেরে যাওয়ার আতঙ্ক ঘিরে ধরে, তখন তাদের পাশে না থাকে পরিবার, না থাকে কোনও বন্ধু। ফলে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে আত্মহননের ইচ্ছা প্রবল হতে থাকে।

আমাদের #YouAreNotAlone কর্মসূচিটির মূল লক্ষ্যই হল কিশোর-কিশোরীদের মানসিক চাপ, অবসাদ, এবং দুশ্চিন্তা সম্পর্কে বোঝানো, যাতে তারা মানসিক রোগ নিয়ে সমস্ত কুন্ঠা কাটিয়ে উঠতে পারে। আমাদের ৯০ মিনিটের সেশনে রেজিস্টার করতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

পুরুষ

সারা বিশ্বের মোট আত্মহত্যার ২৩.৪ শতাংশই ভারতে হয় (সূত্র)। মানসিক রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার ফলে অনেক পুরুষই কোনও রকম চিকিৎসার সাহায্য নিতে অস্বীকার করেন, যাতে কেউ তাদেরকে দুর্বল না ভেবে বসে। এর ফলে অনেক সময়েই অনিয়ন্ত্রিত মানসিক উদ্বেগ তাদেরকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

১৯৯০ সাল থেকে মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘এজ স্ট্যান্ডার্ডাইজড সুইসাইড ডেথ রেট’ অথবা এস.ডি.আর. (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী বয়স অনুপাতে আত্মহত্যার হার) কমলেও, পুরুষদের ক্ষেত্রে কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। ল্যান্সেট পত্রিকার হিসেব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রতি ১,০০,০০০ পুরুষের মধ্যে ২১.২ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কাজেই আমাদের সকলেরই অবিলম্বে এই বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া উচিৎ। ভারতে পুরুষরা প্রধানত যেই সমস্যাগুলিতে ভোগেন তা হল:

  • তীব্র বেকারত্ব
  • দারিদ্রতা
  • আর্থিক সমস্যা
  • মদ্যপানে আসক্তি
  • দুর্বল স্বাস্থ্য

পুরুদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার মূল কারণ হল, দারিদ্রতা ও আর্থিক অনটনের কারণে কৃষকদের আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নেওয়া। সে জন্যই আমাদের উচিৎ মানসিক রোগ নিয়ে আরও সচেতনতা গড়ে তোলা, এবং চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। সেই জন্যই, প্রথমে সবার মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী মনোবিদের কাছে পরামর্শ নেওয়ার ধারণা তৈরী করতে হবে, এবং মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাতে হবে।

আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেন তাহলে আমরা অনুরোধ করব যে সত্বর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার নিকটবর্তী থেরাপিস্টের সাথে যোগাযোগ করতে আপনি আমাদের হেল্পলাইন পার্টনারকে কল করুন অথবা এই click here লিঙ্কে যান

X